আজ ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। জাতি আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিবস পালন করবে। যে কোনো জাতির জীবনেই স্বাধীনতা দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। শুধু মানুষ নয়, কোনো প্রাণিই স্বাধীনতা হীনতায় বাঁচতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হবার পর সকলেই প্রত্যাশা করেছিল, এবার স্বাধীন দেশে আমরা মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে পারবো। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হতে বিলম্ব হয়নি। সে সময় কিছু ভুলের কারণে মুক্তিযুদ্ধের সুফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। স্বাধীনতার পর শুধু ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য রক্ষীবাহিনী এবং যুবলীগের অত্যাচার শুরু হয়। কারণে-অকারণে যাকে তাকে ধরে নিয়ে অত্যাচার করা হতো। এমনকি মেরে ফেলা হতো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন একক দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। সব দল-মতের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছিল। এটা ছিল মূলত জনযুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়। অথচ সে সময় জাতীয় সরকার গঠন করে সম্মিলিতভাবে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল জরুরি। জাতীয় সরকার গঠিত হলে সম্মিলিতভাবে দেশের পুনর্গঠনে কাজ করা সম্ভব হতো। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এক শ্রেণির নেতা-কর্মী দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর কোন কোনটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত হয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গণবাহিনী তৈরি করে শ্রেণি শত্রু খতমের নামে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। গণবাহিনীর হাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হতে থাকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের তারা হত্যা করতো। জাসদের অনেক কর্মী এবং গণবাহিনীর সদস্য রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, যারা সেদিন অস্ত্রের লোভে জাসদের গণবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই পরবর্তীতে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন নি। ফলে তারা দীর্ঘদিন বেকার জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। জাসদের ভুল নীতির কারণে শত শত কর্মী নিহত এবং হাজার হাজার কর্মী দীর্ঘদিন বেকার থেকেছেন। কিন্তু জাসদের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা পরবর্তীতে সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কোন ধরনের অনুশোচনা নেই।

সরকার রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে গণবাহিনীর সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। বিশেষ করে সরকারি দলের লোকদের নির্বিচার লুটপাটের কারণে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়। লাখ লাখ মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে খাদ্যের স্বল্পতা যতটা না দায়ী ছিল তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিল খাদ্য সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছাতে না পারা। সরকার দলীয় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সে সময় দেশের বাইরে খাদ্য পাচার করেছিল। সরকারি দলের এক শ্রেণির নেতা-কর্মীর ব্যাপক লুটপাটের কারণে দেশে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। এমননি এক অবস্থায় বাকশাল গঠন করে রাষ্ট্রক্ষমতা চিরদিনের জন্য কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালানো হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। সেনাবাহিনীর একটি বিক্ষুব্ধ অংশের হাতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারের নিহত হন। কিন্তু দেশে যে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা কোন না কোনভাবে এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি দুর্নীতি কাকে বলে। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। আগে বিদেশী শাসকরা আমাদের দেশ থেকে অর্থ-সম্পদ লুটে তাদের দেশে নিয়ে যেতো। আর এখন আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষ দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে অর্থ উপাজন করে তা বিদেশীদের নিকট দিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর দেশের প্রতিটি খাতকে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। সবচেয়ে ক্ষতি হয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থার। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের নামে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি অবহেলা করা হয়। বাংলায় অনুদিত গ্রন্থের অভাব থাকায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন ব্যাহত হয়। পাবলিক পরীক্ষায় নকলের ছড়াছড়ি শুরু হয়। পদত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে শিক্ষা কার্যক্রমকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। পরীক্ষায় পাশের উচ্চ হার প্রদর্শনের লক্ষ্যে শিক্ষা কার্যক্রমকে দুর্বল করে ফেলা হয়। বর্তমানে দেশে পরীক্ষা পাশের হার এবং শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে ঠিকই কিন্তু তারা কতটা গুণগত মান সম্পন্ন শিক্ষা অর্জন করছে তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের মোট জিডিপি’র অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে প্রতি বছর বাজেটে যে ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয় তার হার জিডিপি’র ২ শতাংশেরও কম। দেশে একের পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান রক্ষার কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। দেশে বর্তমানে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৬টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলোর পড়াশুনার মান গ্রহণীয় মাত্রায় আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেই হবে না তাতে যে পড়াশুনা হচ্ছে তার মান নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

পূর্বেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কোনো একক দলের কারণে স্বাধীন হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব একটি দল তাদের নিজের করে নেয়ার চেষ্টা করেছে। ইতিহাসকে তাদের মতো করে তৈরি করা হয়েছে। যে রাজনৈতিক দল যখনই ক্ষমতায় গিয়েছে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তাদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন। অধ্যাপক মহর আলির স্মরণ সভায় বক্তব্য উপস্থাপনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. আব্দুল মোমিন চৌধুরী বলেছিলেন, ইতিহাস কখনোই আমাদের সর্বসম্মত সত্যে উপনীত হতে সাহায্য করে না, অন্তহীন বিতর্কে নিক্ষেপ করে মাত্র। তার এমন বক্তব্য যে শতভাগ সত্যি তা বেশি ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। অর্ধ শতাব্দী আগে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে চরম বিভ্রান্তি। কোনো একটি ইস্যুতেও আমরা সর্বসম্মতভাবে একমত প্রকাশ করতে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছেন? তাদের সংখ্যা কি ৩০ লাখ নাকি ৩ লাখ তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা, এম এ মোহাইমেন, যিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাকরণ কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হয়েছিল। আমরা গণনা করে ৮৭ হাজার শহীদের তালিকা পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে সাংবাদিক ডেভিড ফস্ট্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দানকালে ভুল করে তিন লাখকে তিন মিলিয়ন বলে ফেলেছিলেন। সে থেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৩০ লাখ হয়ে যায়। আমি এ বক্তব্য বিশ্বাস করতে চাই না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে এটা কিসের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে? এই বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য এখনো তো জরিপ করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ শহীদ হয়েছেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিভ্রান্তি থাকা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধ কারো একক সম্পত্তি নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের একক কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে, যা খুবই দুঃখজনক। দলটির নেতা-নেত্রীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী হিসেবে নিজেদের দাবি করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই দলের হাতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহত্তর পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল দু’টি। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ। পাকিস্তানি শাসক চক্র যদি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতো তাহলে কি মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রয়োজন হতো? পাকিস্তানের দু’ অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল পর্বত প্রমাণ। আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রচারাভিযানকালে ‘‘সোনার বাংলা শ্মশান কেনো?” শিরোনামে যে পোষ্টার প্রকাশ করেছিল তাতে পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে কি অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে নাকি কমেছে? আয় বৈষম্য নির্ধারণকারী সংস্থা গিনি সহগ এর তথ্য মোতাবেক, ১৯৭২-১৯৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের আয় বৈষম্য ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে। বর্তমানে আয় বৈষম্য চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বর্তমানে সমাজে আয়বৈষম্য বাড়ছে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে। বিগত সরকারের আমলে এক শ্রেণির সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সরকারি প্রত্যক্ষ সহায়তায় অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে তা বিদেশে পাচার করেছে। অভিযোগ উঠেছে বিগত সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা বড় বড় প্রকল্প গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে চাপ প্রয়োগ করতো। এসব প্রকল্প থেকে কমিশন গ্রহণ করতো প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের কোনো কোনো সদস্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিপুল অর্থ কমিশনের নামে হাতিয়ে নিয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদন জানিয়েছে, বিগত সরকারের আমলে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ঘুষ গ্রহণ করেছেন ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমলারা ঘুষ নিয়েছেন ৯৮ হাজার কোটি টাকা। শেয়ারবাজার থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রকল্প থেকে লুটপাট করা হয়েছে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা। দুবাইতে বাংলাদেশীদের ৫৩২টি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের বাড়ি রয়েছে ৩ হাজার ৬০০টি। এসব বাড়ির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাড়ি হচ্ছে আমলাদের। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলতে পারি, একজন আমলা যে বেতন- ভাতা পান তা দিয়ে তার স্ট্যাটাস অনুযায়ী সংসার চলার কথা নয়। সে আমলা কিভাবে এত বিপুল সম্পত্তির মালিক হন? বিগত সরকারের আমলে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিগত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে অতীতে আর কোনো সরকারের আমলে তা হয়নি।

বিগত সরকার আমলে ইতিহাসকে বিকৃত করে নিজেদের অনুকূলে বা স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা বা লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু সে উদ্দেশ্য মোটেও সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে তাদের অধীনে জনগণের ভোটাধিকার নিরাপদ নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৩ সালে যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে চারটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল শুধু সেই নির্বাচনগুলোই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। যেহেতু নির্বাচনে জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করবে তাই তারা ২০১১ সালে কোর্টের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ২০১৪, ২০২৮ এবং ২০২৪ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং জঘন্য কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী হিসেবে দাবি করে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগের হাতেই।

আওয়ামী লীগ একটি ক্ষেত্রে খুবই পারদর্শী। দলটি নিজেরা অপকর্ম করে সে অপরাধের দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়। ১৯১৪ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন শুরু করলে বিভিন্নস্থানে গাড়ি পুড়ানো হয়। এসব গাড়ি পুড়ানোর দায়ভার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উপর চাপিয়ে তাদের নির্যাতন করা হয়। কিন্তু এসব অগ্নিসন্ত্রাসের পেছনে যে সরকারি দলই ভূমিকা পালন করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্পট থেকে কোনো অপরাধীকে আটক করা সম্ভব হয়নি। ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০০১ সালে তাদের প্রতিবেদনে দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশকে এক নাম্বার দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করে। আওয়ামী লীগ সে সময় অভিযোগ করতো, জামাত-বিএনপি সরকার আমলে বাংলাদেশ এক নাম্বার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু তারা এটা ভুলে যান যে, ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০২১ সালে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল তার ভিত্তি বছর ছিল ২০০০ সাল। সে সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তাদের শাসনকালের কথা এড়িয়ে যায়। কারণ সে ন্যক্কারজনক শাসনামলের কথা মনে হলে এখনো মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর বিগত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগ যে দুঃশাসন চালিয়েছে তার কথা ভবিষ্যতে কোনো আওয়ামী লীগ কর্মীও মনে করতে চাইবেন না।

এবারের স্বাধীনতা দিবস সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিতে আমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ এখন স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। এখন আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে দেশ গঠনের কাজে এগিয়ে যেতে হবে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

সূত্র , সংগ্রাম