আওরঙ্গজেব কি এতটাই ভয়ংকর ছিলেন? যদি তা–ই হয়, তবে কি ব্রিটিশদেরও প্রচারণা চালানো উচিত হেনরি অষ্টমের সমাধি উড়িয়ে দেওয়ার জন্য? কারণ, তিনি তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ভয়ংকর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। এই রাজা ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ও তাঁর পুত্র হুমায়ুনের সমসাময়িক। বাবর ছিলেন এক কাব্যপ্রেমী, তাঁর আত্মজীবনীতে যার ছাপ স্পষ্ট, আর হুমায়ুন ছিলেন এক রহস্যময় সাধক।

ভারতে মুসলিম শাসকদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীদের ঘৃণা নতুন কিছু নয়। এই ঘৃণা হিটলারের ইহুদি বা আজকের নেতানিয়াহুর ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানো ঘৃণার মতো। কিন্তু বিজেপি যদি সত্যিই ন্যায়বিচার চায়, তাহলে শুধু দেশীয় শাসকদের নয়, ইতিহাসের আরও কিছু নিষ্ঠুর শাসকের দিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

বাবরের রাজত্ব শুরু হওয়ার তিন দশক আগেই ইউরোপীয়রা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করেছিলেন। এরপর ইউরোপীয় শাসকেরা প্রায় ১ হাজার ৫০০ যুদ্ধ, হামলা ও গণহত্যা চালিয়েছেন আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের সময় যেখানে প্রায় এক কোটি আদিবাসী বাস করত। ঊনবিংশ শতকের শেষে ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার্স’ শেষ হওয়ার পর মাত্র আড়াই লাখ আদিবাসী টিকে ছিল।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর বছর, ১৭০৭ সালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল—ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড একীভূত হয়ে গঠন করেছিল গ্রেট ব্রিটেন। এই রাজনৈতিক জোট পশ্চিমা দুনিয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং ব্রিটিশদের আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছিল। তবে এই জোট শুরুর পর থেকেই বারবার বাধার মুখে পড়েছে। স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরা এখনো স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। তারা ইতিহাসের অন্যায় সংশোধন করতে চায়। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা ৩০০ বছর পুরোনো এক সমাধি নিয়ে এত আগ্রহী কেন?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃষ্টিতে আওরঙ্গজেব ছিলেন হিন্দুবিদ্বেষী, যিনি অমুসলিমদের ওপর ‘জিজিয়া’ কর আরোপ করেছিলেন। ইতিহাসবিদেরাও স্বীকার করেন, তিনি বহুজাতিক, বহুধর্মীয় ভারত শাসনকারী মোগলদের মধ্যে সবচেয়ে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির শাসক ছিলেন। তবে ইতিহাসের আরেক দিকও আছে। আওরঙ্গজেব যেমন কিছু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তেমনি অনেক হিন্দু মন্দিরকে অনুদানও দিয়েছিলেন।

আওরঙ্গজেবের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আর বিজেপি রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে সুবিধা নিতে চায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে মহারাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ-মারাঠা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

সত্যি বলতে, বিজেপি তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিষয়টি উসকে না দিলে কেউই আওরঙ্গজেব বা তাঁর সমাধি নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। হিন্দুত্ববাদী প্রচারণাকে আরও উসকে দিয়েছে, যা মোদি সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন পাওয়া একটি হিন্দি চলচ্চিত্র। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে আওরঙ্গজেব নির্মমভাবে মারাঠা শাসক সাম্ভাজিকে হত্যা করেছিলেন। তবে এতে ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি হিন্দুত্ববাদীদের বহু পুরোনো এক কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।

চলুন, একমুহূর্তের জন্য আওরঙ্গজেবের কঠোর সমালোচকদের সান্ত্বনার জন্য ধরে নিই যে আওরঙ্গজেব ছিলেন ভয়ংকর এক শাসক। সিংহাসনের জন্য তিনি তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার বড় ভাই দারা শিকোকে হত্যা করেছিলেন। তিনি শিখ, মারাঠা ও জাঠ কৃষক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় উগ্রতার মধ্যেও কিছু অসংগতি ছিল। তাঁর সেনাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ সেনাপতিরা ছিলেন হিন্দু। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডার মুসলিম শাসকদের আক্রমণ করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি যেমন শিখদের পবিত্র গুরু তেগ বাহাদুরকে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করেছিলেন, তেমনই তিনি সুফি সাধক শাহ সরমদকেও একই নির্মমতায় হত্যা করেছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো ব্রিটিশ কবি টি এস এলিয়টের নাটক মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল-এ বর্ণিত ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আর্চ বিশপ থমাস বেকেটকে হত্যা করিয়েছিলেন। সরমদ ছিলেন ফারসিভাষী এক আর্মেনীয় সুফি। যদিও পরবর্তী সময়ে কট্টর ইসলামি পণ্ডিতেরা তাঁকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেন। দিল্লির জামে মসজিদের পাশেই সরমদের কবর, যা এখনো বহু ধর্মের মানুষের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।

প্রশ্ন হলো, আদর্শ শাসক কে ছিলেন? আওরঙ্গজেব নন, এটা অনেকেই মানেন। কেউ কেউ আকবরকে বলেন আদর্শ শাসক। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা তাঁকেও ঘৃণা করেন। হয়তো আওরঙ্গজেবের চেয়ে বেশি। মুসলিম কট্টরপন্থীরাও আকবরকে পছন্দ করেন না। কারণ, তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন।

তাহলে কি এমন কোনো হিন্দু শাসক ছিলেন, যিনি হিন্দু শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি? নাকি শুধু মুসলিম শাসকেরাই এমন কাজ করেছেন? চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর উপদেষ্টা চাণক্য, কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে মগধের নন্দ শাসকদের পরাজিত করেছিলেন। চাণক্য কি হিন্দু ও অহিন্দুর মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন? না। ঠিক যেমন ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকেরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কখনো পিছপা হননি।

তাহলে আজ মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে তাঁর সমাধি ধ্বংসের জন্য এত হইচই কেন? যদি এই হিন্দুত্ববাদীরা উসকে না দিতেন, তাহলে কি তা খবরের শিরোনামে আসত? ভারতের অর্থনীতি এখন কঠিন সময় পার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। এ বছরের শেষের দিকে বিহার রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। এসব বাস্তব সমস্যার চেয়ে কি ৩০০ বছর পুরোনো এক কবরে হাত দেওয়াটাই বেশি জরুরি?

আওরঙ্গজেবের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আর বিজেপি রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে সুবিধা নিতে চায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে মহারাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ-মারাঠা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির একজন ব্রাহ্মণ। তিনি এক মারাঠা মিত্রকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। শোনা যাচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত মারাঠা নেতা ক্ষোভে ফুঁসছেন।

বিতর্কিত সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে, মারাঠা শাসক সাম্ভাজির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে আওরঙ্গজেবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মারাঠা প্রতিদ্বন্দ্বীরা। কিন্তু পেশাদার ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এই ষড়যন্ত্রকারীরা আসলে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ছবির সহিংসতা এই অস্বস্তিকর সত্য আড়াল করছে। সিনেমাটি দারুণ ব্যবসা করছে, আর আওরঙ্গজেবের পক্ষে তাঁর গল্প পাল্টানো তো দূরের কথা, নিজের কবরও রক্ষা করা সম্ভব নয়।

জাওয়েদ নকভি দিল্লিতে ডন পত্রিকার প্রতিনিধি

ডন থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

সূত্র, প্রথম আলো