বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা হলেও আমদানিনির্ভরতা এখনো প্রকট। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারের আকার প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। তবে খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমদানি করা হয় আরো প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য। সে হিসাবে দেশে মোট কৃষিপণ্যের বাজারের আকার ১৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। ফলে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা কতটুকু যুক্তিসংগত, সে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। আমদানির বিকল্প হিসেবে কৃষিপণ্য উৎপাদনে আরো জোর দেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
কৃষি খাতের বড় উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের চাহিদা মেটাতে ক্ষেত্রবিশেষে ৪০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কৃষিপণ্য আমদানি করতে হয়। সে হিসেবে খাদ্যের একটি বড় অংশই আনতে হয় বিদেশ থেকে। এর পরও দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলাটা অযৌক্তিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। মূলত এ নিয়ে একটি মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যা প্রায়ই সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে শোনা যায়।
জার্মানিভিত্তিক বৈশ্বিক বাজার ও অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্তসংক্রান্ত ডাটাবেজ স্ট্যাটিস্টার হিসাবে, এ বছর বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজারের আকার ১০ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। প্রতি বছরই ২ শতাংশ হারে এ বাজারের আকার বাড়ছে। সে হিসাবে ২০২৯ সালে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের বাজার ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে কৃষিপণ্য আমদানি বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশের চাহিদা মেটাতে এ বছর বিদেশ থেকে আনতে হবে প্রায় ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে দেশে গমের তৈরি খাবারের ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে। অথচ খাদ্যশস্যটির চাহিদার কেবল ১৪-১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। বাকি ৮৫ শতাংশই আনতে হয় বিদেশ থেকে। গত বছর উৎপাদন ও আমদানি মিলে গমের সরবরাহ ছিল ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার টন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, গেল বছর প্রায় ৭২ লাখ ৭৫ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। ২০২৩ সালে হয়েছিল ৫৪ লাখ ১৭ হাজার টন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে গম আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। আমদানি বৃদ্ধির এ হার গত আট বছরে সর্বোচ্চ।
দেশে কোনো সংকট না থাকায় গত অর্থবছর চাল আমদানি করতে হয়নি। তবে সাম্প্রতিক দুটি বন্যার প্রভাবে আমন উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় চালের মৌসুমেও বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ফলে চাহিদা মেটাতে আমদানিতে নজর দিতে হয় সরকারকে। এখন পর্যন্ত ১০ টন চাল আমদানির কথা বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে চাল আমদানির অর্থমূল্য ছিল ৫৪ কোটি ৬২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৫১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের চাল। এছাড়া ১ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের চাল আমদানি হয় গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশেরই প্রায় সব কৃষিপণ্যই আমদানি করতে হয়। তাই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছরই আমাদের খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়। হয়তো উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু তৈরিজাত পণ্য প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আর আমদানি করতে গেলে রিজার্ভেও চাপ তৈরি হয়। তাই আমরা আমদানির বিকল্প পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে জোর দিতে বলেছি। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ভর্তুকি বাড়াতে হবে।’
দেশে মসুর ডালের চাহিদার ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় সাত লাখ টন চাহিদা রয়েছে এ খাদ্যপণ্যটির। এর ৩০ শতাংশ বা দুই লাখ টনের মতো দেশে উৎপাদন হয়। বাকি পাঁচ লাখ টনই আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মসুর ডাল উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার টন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ হাজার টন কম। তাই দেশে উৎপাদন কমতে থাকায় বিদেশী ডালের আমদানিনির্ভরতা বেড়ে চলেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন। এর একটি বড় অংশ অর্থাৎ ২৫-৩০ শতাংশ উৎপাদন, সংগ্রহ, বাজারজাত ও সংরক্ষণ পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। সে কারণে দেশীয় পেঁয়াজের বার্ষিক সরবরাহ প্রায় ২৩-২৪ লাখ টন। ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে কৃষিপণ্যের আমদানি হয় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের। পরবর্তী অর্থবছর তা ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। মূলত টাকার অবমূল্যায়ন ও ডলার সংকট বাড়তে থাকায় আমদানির পরিমাণ কমে যায়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে কৃষিপণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের। তবে ভোজ্যতেল হিসাবে নিলে তা আরো ২ বিলিয়ন করে বেড়ে যাবে।
এফএওর তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়েছে। তার মধ্যে শুধু ধান ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন। ভুট্টা ৪৭ লাখ টন। আর গমের উৎপাদন ছিল ১১ লাখ টন।
কৃষি উদ্যোক্তা ও মাল্টিমোড গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লবণ ছাড়া আমাদের সবকিছুই আমদানি করতে হয়। গত অর্থবছরে চাল আমদানি করা না লাগলেও এবার প্রায় ২৫ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে। ভোজ্যতেল আমাদের ৯৭ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ডাল আমদানি করতে হয় চাহিদার ৮০ শতাংশ। এছাড়া ৮৫ লাখ টন গমের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় মাত্র তিন লাখ টন। ভুট্টা ৮০ লাখ টন চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয় মাত্র ৪০ লাখ টন। এভাবে প্রায় সব পণ্যেরই আমদানি করা লাগে। তবে সবজি আমদানি লাগে না। ডাল, আদা, রসুনও কমেছে। তাই কে বা কারা এটা বলে যে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেটা বোধগম্য নয়। আমদানি কমাতে হলে নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।’
দেশে হলুদ, মরিচ, মৌরি, মেথি, কালিজিরা, তেজপাতা, আদা-রসুন-পেঁয়াজ, সরিষা ও ধনিয়াসহ অধিকাংশ গরম মসলার বাজার আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানি স্বাভাবিক না থাকলে দেশের বাজারে পণ্যগুলোর দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। যেসব পণ্য উৎপাদনের তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে, সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রিপন কুমার মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা তো শুধু ভাত খেয়ে বেঁচে থাকি না। শস্যজাতীয় খাদ্যের উৎপাদন ভালো হলেও অন্য সব পণ্যই আমদানি করতে হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হলে দীর্ঘ পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে। এখানে প্রতিনিয়ত আবাদি জমি কমছে। বিপরীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। তাই বিপুল মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। যেসব কৃষিপণ্য আমরা সহজে উৎপাদন করতে পারি, সেসবের উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য গবেষণা চলমান থাকবে। তবে যেসব পণ্য সহজে উৎপাদন হবে না, তার জন্য আমদানির পথও খোলা রাখতে হবে। আলুর মতো যেসব পণ্যের উৎপাদন বেশি হয়, সেসব পণ্য রফতানির ব্যবস্থা করা যায়।