আজ ২৬ মার্চ। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবস। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার ৫৪টি বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশের মানুষ এখনো স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনি। যে স্বপ্ন, যে চাওয়া আর যে আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল তার অনেকটুকুই এখনো অধরা। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম আওয়ামী সরকারের আমল থেকেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিশাল ব্যবধানটি তৈরি হতে শুরু করে। স্বাধীন দেশের সংবিধান ও শাসন পদ্ধতিতেও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি।

দেশ স্বাধীনের মাত্র তিন বছরের মাথায় দেশের মানুষকে যেমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সহ্য করতে হয়েছে আবার রাজনৈতিকভাবেও একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পদদলিত করা হয়েছে। চারটি পত্রিকা বাদে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। তখন থেকেই এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে হতাশা নেমে আসে কারণ তারা অনুধাবন করেন যে, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও স্বপ্নকে সামনে রেখে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, স্বাধীনতার পর দেশটি যাত্রা করেছে একদমই বিপরীত পথে।

এরপর থেকে বহুদিন, বহু বছর পার হয়েছে। কিন্তু মানুষের সে সুপ্ত আকাক্সক্ষাগুলো আর বাস্তবায়িত হয়নি। জনগণের গনতান্ত্রিক অধিকার, ভোটাধিকার ও সভা সমাবেশ করার অধিকার বারবার হরণ করা হয়েছে। দেশের মানুষের সম্পদ ও নিরাপত্তা বারবার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আইনশৃংখলার অবনতি ঘটানোর মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। নির্বাচনের নামে প্রহসণ করা হয়েছে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার কথা বলে তাদের সাথে পরিহাস করা হয়েছে। ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্যকে অসহনীয় অবস্থায় নিযে যাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারগুলো প্রতিপক্ষ দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করার খেলায় রাষ্ট্রের যাবতীয় উপকরণকে ব্যবহার করেছে। গুম, খুম, হত্যার মতো অপকর্মগুলো বারবার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘঠিত করা হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে ট্যাগ দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা হয়েছে। সমাজের ন্যায়নিষ্ঠ মানুষগুলোকে অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর চরিত্রের দিক থেকে লস্পট, অপরাধী, অর্থ আত্মসাৎকারী ও পাচারকারীদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়েছে।

এরকম একটি অবস্থায় থাকতে থাকতে বিশেষ করে সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের জগদ্দল পাথরের নীচে চাপা পড়ে গোটা দেশ যখন রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ঠিক তেমনই একটি সময়ে গত বছরের জুলাই-আগষ্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের সূচনা হয়। বলা হচ্ছে, এ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন নতুন করে স্বাধীন হলো। জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর এবারই আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন স্বাধীন। মানুষ এখানে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছে। কথা বলতে পারছে। রাজনৈতিক দলগুলো সভা-সমাবেশ করতে পারছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশকে ঘিরে ষড়যন্ত্র অব্যহত রয়েছে। বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য কুচক্রী মহল নানা ধরনের চক্রান্ত করছে। গুজবের পাহাড় সৃষ্টি করে দেশে একটি অস্থিরতা সৃষ্টির পায়তারা করছে। জনগণের সাথে প্রশাসনের এবং দেশপ্রেমিক বাহিনীগুলোর দুরত্ব তৈরি করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশ এবং এর অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ অবস্থায় এবারের স্বাধীনতা দিবস নিঃসন্দেহে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর একটি ভিন্ন ধরনের আবেদন রয়েছে।

আমরা আশা করি, বাংলাদেশের মানুষ বিগত ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হবে। দেশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য যারা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদেরকে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। দেশকে অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ করার কোনো ফাঁদে তারা পা দেবে না। আগ্রাসী যে কোনো শক্তির চোখ রাঙানি থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। এবারের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমরা যেন সত্যিকারের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হই।

একইসাথে, স্বাধীনতার প্রকৃত আনন্দ যেন দেশের প্রতিটি মানুষ একইভাবে উদযাপন করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারসহ প্রতিটি দায়িত্বশীল মহল ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সূত্র , সংগ্রাম