অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। শনিবার দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বিবিসি খ্যাত সাংবাদিক কামাল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। ১৮০ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের নিবর্তনমূলক আইন বাতিল, স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের সচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, কালো টাকার প্রভাবমুক্তকরণসহ ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, কমিশন তার ১১৪ দিনের কার্যক্রম পরিচালনাকালে গণমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক প্রতিনিধিসহ অংশীজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন শহরে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করেছেন। কমিশন ৫৫টি বৈঠক করে তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছেন। এসব বৈঠকে ১ হাজার ৪০০ অংশীজন অংশ নেন।
গণমাধ্যম কমিশন গত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে জেল-জুলুমসহ নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার তিনজন প্রবীণ সম্পাদকসহ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিকের চিত্র তুলে ধরেছে। পতিত শেখ হাসিনার সময়কালকে ‘নৈরাজ্যের যুগ’ শিরোনামে অভিহিত করে প্রতিবেদনের একটি অংশে ওই সময় গণমাধ্যম বিরোধী যেসব ঘটনা ঘটেছে তার একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে কমিশন। সংস্কার কমিশন বলেছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক রূপান্তর দেখেছে। এ সময় বিরোধীদলকে নির্মূল করার প্রক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যম যেমন সরাসরি সরকার ও সরকার সমর্থকদের আক্রমণের শিকার হয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠনাগুলোও তাদের আইনগত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন ও নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিয়েছে, আদালত ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বিচারকদের কেউ কেউ রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, দেশের তিনজন সুপরিচিত সম্পাদককে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। বারবার রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকতে হয়েছে। সম্পাদকদের ওপর শুধু নির্যাতন নয় হামলাও চালানো হয়। আপসহীন এ তিন সম্পাদক হলেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ এবং দৈনিক যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান। দৈনিক সংগ্রামের প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদ প্রসঙ্গে কমিশনের প্রতিবদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের জেরে সম্পাদক আবুল আসাদকে তার দপ্তরে ঢুকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা। এরা তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর পুলিশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আবুল আসাদের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং প্রায় পাঁচ বছর তিনি বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমের কাছ থেকে আনুগত্য আদায়ের জন্য বিগ ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার করেছে। এরমধ্যে রয়েছে প্রকাশনা ও সম্প্রচার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা; নিউজপ্রিন্ট ও সম্প্রচার সরঞ্জামসহ মুদ্রণসামগ্রীর ওপর সীমাবদ্ধ আমদানি শুল্ক আরোপ; সরকারী বিজ্ঞাপন বরাদ্দ; এ ধরনের বিজ্ঞাপনের অর্থ পরিশোধে বিলম¦ করা; সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অফিসিয়াল কার্যক্রমে প্রবেশাধিকার সীমিত করা; সরকারি ও অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ প্রদান; হুমকি ও হয়রানির জন্য আইন প্রয়োগ করা এবং মাঝে মাঝে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া। প্রতিবেদনে আরও অনেক কিছু উঠে এসেছে বিগত ফ্যাসিস্ট আমল সম্পর্কে। এক কথায় ওই আমলকে বলা যায় অন্ধকার ও নৈরাজ্যের যুগ। এমন যুগ যেন আর কখনো না আসে, সেই প্রত্যয়ে এখন কর্তব্য স্থির করা প্রয়োজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ছাত্র-জনতা তথা পুরো জাতির। কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে আবারও ফিরতে পারে অন্ধকার যুগ। অতএব সাবধান।