তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী স্বৈরাচারকে প্রতিষ্ঠিত, প্রলম্বিত ও বৈধতা প্রদান করার দায়ে সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএনপি। বহুল আলোচিত তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে। এই তিন নির্বাচন কমিশনের সিইসি ছিলেন ক্রমানুসারে কাজী রকিব উদ্দীন, কে এম নূরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়াল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা রয়েছেন মামলার আসামী। আসামীরা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন না করে ভয়ভীতি দেখিয়ে জনগণের ভোট ছাড়াই নির্বাচন করে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন বলে শেরে বাংলা নগর এলাকায় দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, সব নষ্টের মূলে যে তিন নির্বাচন কমিশন, তাদের প্রধানসহ সব সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যের বিরুদ্ধে অনেক আগেই মামলা করা উচিত ছিল। আশা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে মামলা দায়ের করা হবে। সরকার তা করেনি। তিন নির্বাচনের বিষয়ে আলাদা কমিশন করে একটি অনুপুংখ তদন্ত অনুষ্ঠানের তাকিদ উচ্চারিত হলেও সরকার সেটাও করেনি। শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে মামলা করে জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হয়েছে। তিন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ ছিল প্রচন্ড। কারণ, কমিশনগুলোর দুষ্কৃতীর কারণে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। বিএনপি এই গণক্ষোভের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। মামলা করে বিএনপি দেশের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা সংযুক্ত করেছে বলে পর্যবেক্ষকদের অনেকের অভিমত। এ জন্য বিএনপি ধন্যবাদার্হ। যাইহোক, বিএনপির মামলা দায়েরের পর ইতোমধ্যে রাতের ভোটের কারিগর কে এম নূরুল হুদা গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। বাদ আছেন ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত এক তরফা নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনকারী কাজী হাবিবুল আউয়াল এবং ২০১৪ সালের অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রধান কারিগর কাজী রকিব উদ্দিন। তারাসহ বাকী আসামীদের, পলাতক ছাড়া, সবাই অচিরেই গ্রেফতার হবেন বলে আশা করা যায়। কে এম নুরুল হুদা গ্রেফতারের আগে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা অনাকাক্সিক্ষত এবং যারাই এটা করেছে, ভালো করেনি। অপরাধী যত ঘৃণ্য হোক, তার প্রতি এহেন আচরণ কাম্য হতে পারে না। পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেছেন, কে এম নুরুল হুদারা যে পাপ ও অন্যায় করেছেন, তার জন্য তাদের মৃত্যুদ-ও যথেষ্ট শাস্তি নয়। তাদের যথাযথ বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।

পর পর তিনটি জাতীয় নির্বাচন ভোটারবিহীন, ভুয়া, পরিকল্পিত ও চক্রান্তমূলক হওয়ায় জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দেশের মালিক হয়েও পছন্দের শাসক বা সরকার নির্বাচন করতে পারেনি। অন্যদিকে এসব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার তার অবস্থান ও শক্তি বৃদ্ধি করেছে, নিজেকে বেপরোয়া করে তুলেছে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর দেশে অনাচার, অবিচার, অত্যাচার, নির্যাতন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, রাষ্ট্রীয় অর্থের লুট ও পাচারসহ যত অন্যায় কাজ হয়েছে, তার জন্য পতিত ও বিতাড়িত স্বৈরাচার এককভাবে দায়ী। আর এই স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় রাখার বৈধতা দিয়েছে কথিত তিন নির্বাচন। স্বৈরাচার দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছে। গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছে, রাজনৈতিক অধিকার অগ্রাহ্য হয়েছে, সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। সংবিধান ইচ্ছামতো কাটাছেড়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে। বিচার বিভাগ, পুলিশ ইত্যাদি দলীয়করণ করে অকার্যকর করা হয়েছে। মিডিয়াকে সম্পূর্ণ করায়ত্ত করা হয়েছে। সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করে ফেলা হয়েছে। দেশকে কার্যত ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। স্বৈরাচার একদিনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। দিনে দিনে তার প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর জনমনে এমন ধারণা দৃঢ়বদ্ধ হয় যে, কোনো সংগ্রাম-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে হটানো সম্ভব হবে না। প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসাবেই হয়তো একদিন স্বৈরাচারের পতন ঘটবে। তবে সেই ‘একদিন’ কবে আসবে, কারো পক্ষে তা নিশ্চয় করে বলা সম্ভব হয়নি। এ দেশে যে স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা পায়, তা বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার হিসাবে অভিহিত হয়েছে। বিস্ময়করই বটে, এহেন স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও মাফিয়াতন্ত্র মাত্র এক মাসের গণআন্দোলনে বিদায় নিয়েছে। ২৪’এর ৫ আগস্ট নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে পালিয়ে গেছেন ভারতে। তার সাঙ্গপাঙ্গরা অনেকেই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বাকিদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, অনেকে পলাতক রয়েছেন। দুঃশাসন বা দুর্বৃত্তের শাসন কখনো স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। এক সময় তার চিরাবসান নিশ্চিত। আমাদের দেশের ঘৃণ্যতম স্বৈরাচারের পতন এর জলন্ত প্রমাণ।

আগেই বলা হয়েছে, আওয়ামী স্বৈরাচারের বেড়ে ওঠা, বৈধতা ও প্রতিষ্ঠা লাভের পেছনে সবচেয়ে নিয়ামক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে তিন নির্বাচন কমিশন। সেই তিন নির্বাচন কমিশনের প্রধানসহ অন্যান্য সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের বিচার ও শাস্তি গণদাবির অংশ। অনেকেরই স্মরণ আছে, তিন নির্বাচন কমিশনের যারা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মধ্যে মাহবুব তালুকদার অবশ্যই ব্যতিক্রম। তিনি কে এম নূরুল হুদা কমিশনের সদস্য হয়েও নির্বাচনের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছিলেন। বিভিন্ন সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। তিনি ছাড়া বাকি সদস্যরা বিবেকের ডাকে সাড়া দিতে পারেননি। এই বিবেক বিক্রেতা সদস্যসহ ওই তিন নির্বাচনের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন, যারা নির্বাচন পরিচালনা ও ভোট গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের সবাইকে জবাবদিহি ও আইনের আওতায় আনার আবশ্যকতা প্রশ্নাতীত। আমরা আশা করবো, সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেবে। কোনো প্রতিষ্ঠান তার কৃতকর্মের জন্য কোনোক্রমেই দায়মুক্তি ভোগ করতে পারে না। নির্বাচন কমিশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যার সিদ্ধান্ত ও কর্মের সঙ্গে শাসক বা সরকার নির্বাচনের সম্পর্ক ওতপ্রোত, তার জবাবদিহি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্যই তিন নির্বাচন কমিশনের সকল সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের বিচার করে আইন মোতাবেক শাস্তি দিতে হবে। ভবিষ্যতের যে কোনো নির্বাচন কমিশনের জন্য এটা হবে একটা সতর্ক বার্তা ও শিক্ষা। নির্বাচন কমিশন নির্বাহী বিভাগের একসটেনশান বা বারান্দা, এ ধারণা ভাঙার সময় এসেছে এবং অবশ্যই তা ভাঙতে হবে।

সূত্র, ইনকিলাব