‘দাঙ্গা’ বাংলাভাষার একটি শব্দ, তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এ শব্দের একটি চিত্র আছেÑ যাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে হত্যা, ধ্বংস, ধর্ষণ ও উগ্রতার যাবতীয় পাশবিক কর্মকাণ্ড। এমন কাণ্ডের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটিতে প্রায়ই ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গত এখানে দিল্লি-দাঙ্গার কথা উল্লেখ করা যায়। বিষয়টি নিয়ে বিবিসির অনুসন্ধান প্রতিবেদন রয়েছে। উল্লেখ্য যে, পাঁচ বছর আগে ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানী দিল্লিতে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ওই দাঙ্গায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যার বেশিরভাগই মুসলমান। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার প্রণীত ‘বিতর্কিত নসাগরিকত্ব আইন’ নিয়ে দেশটির মুসলমানদের বিক্ষোভের পর ওই দাঙ্গা শুরু হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দাঙ্গার পর পুলিশের দায়ের করা মামলাগুলোয় প্রকৃত অপরাধীদের বদলে ভুক্তভোগীদের অপরাধী সাজানো হয়। দাঙ্গার পাঁচ বছর পরও ওই মামলাগুলোর মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। দাঙ্গার সময় বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পুলিশের নিষ্ঠুর ও দ্বৈত আচরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। ভারতীয় পুলিশের তদন্তে অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালে ভারতের পার্লামেন্টে বিতর্কিত নাগরিক আইন সিএএর বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ‘ভারতের একতাকে হুমকিতে ফেলার’ বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটায়। এ তদন্তের অংশ হিসেবে ৭৫৮টি মামলা দায়ের করে পুলিশ এবং এর আওতায় দু’হাজারের বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া ‘প্রধান ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে ভারতের কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার আওতায় ১৮ ছাত্রনেতা ও অধিকারকর্মীকে গ্রেফতার করা হয। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে গ্রেফতার ব্যক্তির জামিন পাওয়া প্রায়ই অসম্ভব। ওই মামলায় পাঁচ বছরে মাত্র ছয়জন জামিনে বের হতে পেরেছেন। এখনো কারাগারেই বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষা করছেন মুসলিম ছাত্রনেতা উমর খালিদসহ ১২ বন্দি।
বিবিসি দাঙ্গার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭৫৮টি মামলার অবস্থা নিরীক্ষণ করে এবং দিল্লির কড়কড়ডুমা আদালতের রায় দেওয়া ১২৬টি মামলা বিশ্লেষণ করে। কড়কড়ডুমা আদালতের রায় দেওয়া ৮০ ভাগ মামলাই সাক্ষীর বৈরিতায় খারিজ করে দেওয়া হয় বা আসামীকে খালাস দেওয়া হয়। মাত্র ২০টি মামলায় অভিযুক্তদের দায়ী করে রায় দেওয়া হয়। উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন মামলার রায়ে তদন্তে ব্যর্থতার জন্য দিল্লি পুলিশকে তিরস্কার করেন আদালত। কোনো ক্ষেত্রে পুলিশকে ‘পূর্বনির্ধারিত চার্জশিট’ দিয়ে অভিযুক্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘অপরাধের সঙ্গে যুক্ত’ হিসেবে দেখানোর জন্য সমালোচনা করা হয়। ১২৬টি মামলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তাদের সাক্ষকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হিসাবে পায়নি আদালত। বিবিসি দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের কাছ থেকে কোনা উত্তর পাওয়া যায়নি। গত বছরের এপ্রিলে আদালতে এক মামলার বিষয়ে পুলিশ জানায়, সব ধরনের তদন্ত ‘বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীনভাবে’ করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযুক্তদের সাক্ষ্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণ বলছে ভিন্ন কথা।
দাঙ্গার দায়ে গ্রেফতার হয়ে ৮০ দিন জেল খাটেন শাদাব আলম। তিনি বলেন, দাঙ্গা শুরু হলে অন্যদের সঙ্গে তার দোকানের ছাদে আশ্রয় নেন। এর কয়েক ঘন্টা আগেই পুলিশ এসে তাদের দোকান বন্ধ করতে বলেন। বিবিসিকে শাদাব জানায়, হঠাৎ করে কিছু পুলিশ সদস্য এসে তাদের ধরে ভ্যানে ওঠায়। জিজ্ঞাসা করা হলে পুলিশ জানায়, দাঙ্গায় অংশগ্রহণের জন্য তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ আমাদের নাম জানার পর মারপিট করে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই মুসলিম। পুলিশ শাদাব আলমসহ ১০ মুসলমান বাসিন্দাকে একটি দোকান পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। কিন্তু বিচার শুরু হওয়ার আগেই আদালত তা খারিজ করে দেন। আদালতের পার্যবেক্ষণে বলা হয়, এ মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য ‘বানোয়াট’ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ওই দোকান ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খল জনতা’ পুড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে। আদালতের রায়ে বলা হয়, পুলিশ মামলাটির যথার্থ তদন্ত করেনি। এমন চিত্র থেকে ভারতের সমাজে সংখ্যালঘু মুসলমানদের দুরবস্থা উপলব্ধি করা যায়। বিজেপির সাম্প্রদায়িক উগ্রতার প্রভাব পড়েছে পুলিশ প্রশাসনেও। ফলে দাঙ্গার সময় সংখ্যালঘু মুসলমানরা যেমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়, আবার দাঙ্গার পরেও মজলুমদের অভিযুক্ত করেই মামলা সাজানো হয়। তবে সব আদালতে নয়, কোনো কোনো আদালতে মজলুমরা সুবিচার পায় এবং পুলিশও হয় তিরস্কৃত। জানিনা, পৃথিবীর ‘বৃহৎ গণতান্ত্রিক’ দেশ ভারত উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে কবে মুক্ত হবে। অথচ এই ভারতের রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংকতার মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা চালাতে বেশ উৎসাহী। এতে কি আসলেই কারো কেনো কল্যাণ হয়? এজন্যই বিদ্বজনরা বলে থাকে, আপনি আচরি পরকে শেখাও।